![]()


ডেইলি সিলেট ডেস্ক ::
একসময় দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত গণভবন এখন রূপ নিয়েছে ‘জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ। একেক কক্ষে একেকটি গল্প। কোথাও রক্তমাখা পোশাক, কোথাও দেয়ালজুড়ে ছবি, সময়রেখা আর অসংখ্য মুখ যাদের কেউ আর ফিরবে না। কারো কারো জীবন বয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষত বলছি জুলাই ৩৬ গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে কথা।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ১৭ একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা স্মারক, দলিল ও নিদর্শন।
জাদুঘরের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই লাল ইটের পথের দুই পাশে দেখা যাবে বিভিন্ন ফলজ গাছ। পথের পাশেই রয়েছে ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’ শীর্ষক প্রদর্শনী, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ ‘জুলাই মেমোরিয়াল’। প্রধান ফটকের দক্ষিণ পাশে সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত বৃত্তাকার এই স্মৃতিস্তম্ভে উৎকীর্ণ রয়েছে আন্দোলনে নিহতদের নাম। ভেতরের অংশটি প্রতীকী কবরস্থানের আদলে সাজানো হয়েছে।
খোলা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্থানে জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে একাধিক ভাস্কর্য। এর মধ্যে রয়েছে রিকশায় গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির প্রতীকী দৃশ্য, সাঁজোয়া যানে ঝুলন্ত আন্দোলনকারীর ভাস্কর্য এবং সাইকেলে মিছিলে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর প্রতিরূপ। পাশাপাশি পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, গুমের অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং নারী আন্দোলনকারীদের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্যও রয়েছে।
জাদুঘরের দক্ষিণ প্রান্তে গড়ে তোলা হয়েছে আলোচিত ‘আয়নাঘর’-এর আদলে একটি প্রতীকী কক্ষ, যেখানে গুমের অভিযোগে ব্যবহৃত কথিত গোপন বন্দিশালার পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে।
দোতলা মূল ভবনের নিচতলায় সংরক্ষণ করা হয়েছে বিভিন্ন দলিল, আলোকচিত্র, ভিডিও, প্রামাণ্য উপকরণ এবং সাবেক সরকারি বাসভবনে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক সামগ্রী। একটি বড় কক্ষে রয়েছে গোলক আকৃতির ডিজিটাল ডিসপ্লে, যেখানে বিভিন্ন ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয়।
এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বৈঠককক্ষ বা ‘কল রুম’ বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের সময় কক্ষটির যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা অক্ষত রাখতে পুরো মেঝে কাচ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে সেই দৃশ্য দেখতে পারবেন।
দ্বিতীয় তলায় স্থান পেয়েছে জুলাই আন্দোলনের শত শত শহীদের ব্যবহৃত পোশাক, বই, খাতা, ক্রীড়া সামগ্রীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত স্মারক। এখানে শহীদ আবু ইসাহাকের রক্তমাখা পোশাকও প্রদর্শন করা হয়েছে।
এই তলায় আন্দোলনের দিনভিত্তিক টাইমলাইন আলোকচিত্র, ভিডিও, দলিল ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট’ কক্ষ, যেখানে ৩৬০ ডিগ্রি প্রযুক্তির ডিজিটাল প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহের ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন কক্ষে মিছিল, নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, সূচিকর্ম, ডিজিটাল পোস্টার, ভাস্কর্য ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নানা অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে।
দর্শনার্থীদের জন্য সময়সূচি ও টিকিট প্রতিদিন তিনটি নির্ধারিত স্লটে মূল ভবন পরিদর্শনের সুযোগ থাকবে। প্রথম স্লট সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা, দ্বিতীয় স্লট দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টা এবং তৃতীয় স্লট বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। নির্ধারিত সময় শেষে দর্শনার্থীরা জাদুঘরের প্রাঙ্গণ, পুকুরপাড় ও ক্যাফেটেরিয়ায় সময় কাটাতে পারবেন।
জাদুঘরে প্রবেশের টিকিট মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা। টিকিট অনলাইনের পাশাপাশি জাদুঘরের কাউন্টার থেকেও সংগ্রহ করা যাবে।